কৃষি জমি রক্ষায় আইনী পদক্ষেপ জরুরি

০৫ জুন ২০১৫, বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষ্যে আলোচনা সভা
হৈমন্তী সম্মেলন কক্ষ, বনভবন, আগারগাও, ঢাকা

কৃষি আমাদের দেশের অর্থনীতির প্রাণ। এদেশের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ কৃষি কাজের সাথে জড়িত। প্রাকৃতিক আর কৃত্রিম যে কোন দূর্যোগকে চ্যালেঞ্জ করে এই কৃষকরা আমাদের জন্য খাদ্যের যোগান নিশ্চিত করে। উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, নিজের জমি না থাকা এগুলোর কৃষকদের অতিপ্রাচীন অমিমাংসিত সমস্যা। বাংলাদেশের জনসংখ্যার কোটি ৭৬ লাখ ৮০৪টি কৃষক পরিবার রয়েছে। অধিকাংশ কৃষক অন্যের জমি চাষ করে, বিশাল দেশের জন্য খাদ্যের যোগান নিশ্চিত করছে। কিন্তু বিগত কয়েক দশক ধরে ছিনিয়ে নেয়া হচ্ছে কৃষককের সেই জমিও।

১৯৭৬ সালে বাংলাদেশে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল দশমিক ৭৬২ মিলিয়ন হেক্টর। গত বছরগুলোতে জমির পরিমাণ কমেছে দশমিক ২৪২ মিলিয়ন হেক্টর। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়নের জন্য কৃষিজমি অকৃষিতে পরিণত হচ্ছে। শিল্পায়ন আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার জন্য কি প্রকারের ভূমি ব্যবহার করা দরকার সে বিষয় নিয়ে ভাববার সময় এসেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে মাথাপিছু আবাদযোগ্য জমি কমতে কমতে প্রান্তসীমায় এসে দাঁড়িয়েছে। এভাবে কৃষিজমি কমতে থাকলে দেশের ৬৮ শতাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা চরম হুমকির সম্মুখীন হবে

বাণিজ্যিক কারণে দেশে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার ৯৬ বিঘা বা ৬৯২ একর কৃষি জমি হারিয়ে যাচ্ছে। রূপান্তরিত জমির পুরোটাই অকৃষি খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। জলাশয় ভরাট করে প্রতিদিন মোট কৃষি জমি কমছে ৯৬ বিঘা। তামাক চাষের কারণে প্রতিদিন নয় হাজার একর কৃষি জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। এভাবে কৃষি জমি কমতে থাকলে দেশের ৬৮ শতাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা চরম হুমকির সম্মুখীন হবে। পরিসংখ্যান বলছে, গত ১১ বছরে মোট ২৬ লাখ ৫৫ হাজার ৭৩১ একর কৃষি জমি অকৃষি খাতে চলে গেছে। ১১ জেলায় গবেষণায় দেখা গেছেকক্সবাজার, কুষ্টিয়া মানিকগঞ্জ জেলাতে কৃষি জমির বাণিজ্যিক ব্যবহার সবচেয়ে বেশি

বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান এ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এক গবেষণায় বলেছে, বাংলাদেশে মোট ভূমির পরিমাণ প্রায় ১৪ দশমিক মিলিয়ন হেক্টর। যার প্রায় ১৩ দশমিক শতাংশ জুড়ে বনভূমি। ২০ দশমিক শতাংশে স্থায়ী জলাধার, ঘরবাড়ি, শিল্প-কারখানারাস্তাঘাট ইত্যাদি, অবশিষ্ট ৬৬ দশমিক শতাংশ জমি কৃষি কাজের জন্য ব্যবহার করা হয়। বাস্তবতা হলো কৃষি জমির পরিমাণ কমছে আশঙ্কাজনক হারে। জমি কমায় আগামী ১০ বছরেই আমাদের ভাতে মরার আশঙ্কা হয়ে দেখা দিতে পারে। গবেষণায় বলা হয়, দেশে ২০০৩ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে মোট ২৬ লাখ ৫৫ হাজার ৭৩১ একর বা ৮০ লাখ ৩৩ হাজার বিঘা কৃষি জমিঅকৃষি খাতে চলে গেছে। এই হিসেবে বছরে রূপান্তরের পরিমাণ লাখ ৩০ হাজার ৩২৬ বিঘা জমি। আর প্রতিদিন কমছে দুই হাজার বিঘা কৃষি জমি। জলাশয় ভরাট করে প্রতিদিন মোট কৃষি জমি কমছে ৯৬ বিঘা।

অপরদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য মতে, দেশে বর্তমানে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৯০ লাখ ৯৮ হাজার ৪৬০ হেক্টর। এর মধ্যে আবাদযোগ্য পতিত জমি হচ্ছে ১৫ লাখ ৯৮ হাজার হেক্টর। বেসরকারি হিসাব মতে, প্রতিদিন ২২০ হেক্টর কৃষি জমি হারিয়ে যাচ্ছে, যা বছরে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ৮০ হাজার হেক্টরেরও বেশি। ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০ বছরে কৃষি জমির পরিমাণ নেমে দাঁড়াবে ৫০ হাজার হেক্টরে, যা রীতিমতো উদ্বেগজনক

এসআরডিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী বিভাগওয়ারি অকৃষি খাতে জমি চলে যাওয়ার প্রবণতা চট্টগ্রাম বিভাগে বেশি। চট্টগ্রাম বিভাগে প্রতিবছর ১৭ হাজার ৯৬৮ হেক্টর জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। অন্যান্য বিভাগের বেলায় দেখা যাচ্ছে রাজশাহী বিভাগে ১৫ হাজার ৯৪৫ হেক্টরঢাকায় ১৫ হাজার ১৩১ হেক্টর, খুলনায় ১১ হাজার ৯৬ হেক্টর, রংপুরে হাজার ৭৮১ হেক্টর, বরিশালে ৬ হাজার ৬৬১ হেক্টর জমি প্রতিবছর অকৃষি জমিতে পরিণত হচ্ছে। কৃষি জমি অকৃষি জমিতে পরিণত হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে অপরিকল্পিত নগরায়ন শিল্পায়ন। আর কিছু জমি অকার্যকর হয়ে উঠেছে বাণিজ্যিকভিত্তিতে চাষাবাদের কারণে।

কৃষি জমি কমার অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে বাড়িঘর তৈরি। গত ৩৭ বছরে শুধুমাত্র ঘরবাড়ি নির্মাণ হয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার একর জমিতে। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুসারে বসতবাড়ির সংখ্যা ছিল দুই কোটি সাড়ে ৪৮ লাখ। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে বসতবাড়ির সংখ্যা তিন কোটি ২১ লাখ ৭৩ হাজার ৬৩০। বসতবাড়ি এলাকার পরিমাণ ১৯৯৬-২০০৮ সময়ে তিন লাখ ৫২ হাজার একর থেকে বেড়ে ছয় লাখ ৭৭ হাজার একরে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্ব উন্নয়ন সূচক ২০০৯থেকে জানা যায়, ১৯৯০ সালে দেশের ২০ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করত। ২০০৭ সালে তা বেড়ে হয় ২৭ শতাংশ। বৃদ্ধির এই হার দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নতুন নতুন শহর হচ্ছে। বাড়ছে রাস্তাঘাট। রাস্তাঘাটের বড় অংশই হচ্ছে কৃষিজমিতে।

সড়ক ধ্বংশ করছে কৃষি জমি

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১২ অনুযায়ী, ২০০১ সালে দেশে জাতীয় মহাসড়কের পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৮৬ কিলোমিটার। বর্তমানে জাতীয় মহাসড়ক আছে তিন হাজার ৫৪৪ কিলোমিটার। আঞ্চলিক মহাসড়ক চার হাজার ২৭৮ জেলা সড়ক রয়েছে ১৩ হাজার ৬৫৯ দশমিক ১৩ কিলোমিটার। সব মিলিয়ে সড়ক জনপথের রাস্তার পরিমাণ ২১ হাজার ৪৮১ কিলোমিটার। এলজিইডির ৮০ হাজার ১১৯ কিলোমিটার পাকা সড়ক রয়েছে

তামাক চাষ গ্রাস করছে, খাদ্যের জমি

তামাক চাষ ১৯৬৪ সালে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করে। এরপর স্বাধীনতার পর তারা ব্যাপকভাবে চাষ শুরু করে এবং এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় সম্প্রসারণ করতে থাকে। মাত্র দুতিনটি তামাক পাতার জাত যেমন মতিহারী, বার্লী ভার্জিনিয়া যাকে ফ্লু কিউর্ড ভার্জিনিয়া (ঋঈঠ) বলা হয়তার চাষ সবচেয়ে বেশী হয়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ১০৮,০০০ হেক্টর জমিতে সারাদেশে বিভিন্ন জেলায় তামাক চাষ হচ্ছে।

উবেনীগের গবেষণায় দেখা গেছে কুষ্টিয়ায় দীর্ঘদিন তামাক চাষের কারণে জমির উর্বরতা নষ্ট হবার পর কক্সবাজার বান্দরবানসহ নতুন নতুন এলাকায় তামাক চাষের এলাকা বাড়ানো হচ্ছে। কক্সবাজার-বান্দরবান এলাকায় ১৯৯৮ সালে তামাক চাষ ছিল মাত্র ৭৪০ একর জমিতে কিন্তু ২০০৫-২০০৬ সালে এসে তা বেড়ে যায় ৪৭৫০ একর জমিতে অর্থাৎ ৫৪০% বৃদ্ধি পেয়েছে। কুষ্টিয়াতে নতুন এলাকায় গেলেও তা বেড়েছে ৪১%, কারণ সেখানে জমির উর্বরতা নষ্ট হয়ে গেছে এবং জ্বালানী কাঠ আর নেই। গত (২০১৪-১৫) মৌসুমে চকরিয়াতে তামাক চাষ হয়েছে ৮৭৫০ একর জমিতে এবং বান্দরবানের আলীকদম লামায় ১০,২০০ একর জমিতে তামাক চাষ হয়। এতো পরিমান জমিতে তামাক চাষ হওয়ার অর্থ হচ্ছে এই জমিতে কোন খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে না

 

জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি ২০১০এবংকৃষিজমি সুরক্ষা ভূমি জোনিং আইন ২০১০

পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনিজাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি ২০১০এবং কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইন-২০১০। আইন নীতি অনুসারে কৃষি জমি কৃষি কাজ ব্যতীত অন্য কোন কাজে ব্যবহার করা যাবে না। কোন কৃষি জমি ভরাট করে বাড়িঘর, শিল্প-কারখানা, ইটভাঁটি বা অন্য কোন অকৃষি স্থাপনা কোনভাবেই নির্মাণ করা যাবে না উল্লেখ থাকলেও প্রতিনিয়তই কৃষি জমি ব্যবহƒ হচ্ছে অকৃষি কাজে। ২১টি জেলার ১৫২টি উপজেলায় ল্যান্ড জোনিং কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হলেও তদারকি নেই।

 

আইনে বলা হয়েছে ভূমিহীনরা খাস জমি বরাদ্ধ পাবে এবং খাস জমিতে কৃষি ভিন্ন অন্য কাজ করা যাবে না। ৮০ শতাংশ সরকারী খাস জমিতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। এক শ্রেণীর অসাধুচক্র দখল করেছে খাস জমি। নির্মাণ কাজের জন্য বছরে বিলীন হচ্ছে তিন হাজার হেক্টর জমি।

প্রস্তাবিত আইনে যা আছে, প্রস্তাবিত কৃষি জমি সুরক্ষা ভূমি ব্যবহার আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে কৃষি জমিতে আবাসন, শিল্প-কারখানা, ইটভাঁটি বা অন্য কোন রকম অকৃষি স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। জমি যে ধরনেরই হোক না কেন, তা কৃষি জমি হিসেবেই ব্যবহার করতে হবে। দেশের যে কোন স্থানের কৃষি জমি আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত হবে এবং কোনভাবেই তা ব্যবহারে পরিবর্তন আনা যাবে না। কোন অবস্থাতেই উর্বর জমিতে কোন স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেয়া যাবে না। যে কোন ধরনের জমির শ্রেণী পরিবর্তন করা যাবে না।

আইনে বিচার দন্ড হিসেবে বলা হয়েছে, আইন লঙ্ঘনকারী বা সহায়তাকারীর অনুর্ধ দুই বছর কারাদন্ড বা সর্বনিম্ন ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ড কিংবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে। আইনের অধীনে অপরাধ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য আপোসযোগ্য হবে এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা সংশ্লিষ্ট রাজস্ব কর্মকর্তা কিংবা বন মৎস্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মামলা করতে পারবেন। কিন্তু আইনটি পাশের ক্ষেত্রে এখনো কোন অগ্রগতি নেই।

বাংলাদেশ সংবিধানের ১৮ অনুচ্ছেদ বলা হয়েছে ‘‘ রাষ্ট্র বর্তমান ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব-বৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণির সংরক্ষণ নিরাপত্তা বিধান করিবেন’’ কৃষি জমি শুধু আমাদের প্রজন্ম ভোগ করলে চলবে না। আগামী প্রজন্মের জন্য কৃষি জমি রক্ষা আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব। আসুন কৃষিজমি সুরক্ষা ভূমি জোনিং আইন রক্ষা সচেষ্ট হই।

১  http://www.thereport24.com/article/31242/index.html
 গায়েব কৃষি জমি http://www.dailyjanakantha.com/print/print_details.php?csl=120716
কৃষি জমি-ভুমি সুরক্ষা করতে হবে  http://www.alokitobangladesh.com/editorial/2013/05/28/2258/print
 http://www.thereport24.com/article/31242/index.html
 http://ubinig.org/index.php/home/printAerticle/92/bangla

Style Selector

Layout Style

Predefined Colors

Background Image