নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত আইন বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

Policy Briefing Paper
Safe Food, Issue-3, December 2015

খাদ্য কিভাবে বিষাক্ত করা হচ্ছে তা প্রায় সকলের জানা। অনেকেই জানার ইচ্ছে কেন এই খাদ্যের বিষাক্ততা বন্ধ করা হচ্ছে না। আর এ বাস্তবতা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে ‘‘নিরাপদ খাবার সুস্থ্য জীবনের অঙ্গীকার’’ এই প্রতিপাদ্য নিয়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। কিছু ব্যক্তি শুধুমাত্র তাদের মুনাফার জন্য কোটি কোটি মানুষের স্বাস্থ্যকে ধ্বংশ করছে। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা এই সকল  মুনাফা লোভী নীরব ঘাতকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সকলের জোর দাবি করা উচিত। 

বর্তমানে খাদ্য উৎপাদন থেকে বিপনন সকল পর্যায়েই খাদ্যে বিষাক্ত করা হচ্ছে। সরাসরি বিষ বা রাসায়নিক ব্যবহার করে যারা খাদ্যকে বিষাক্ত করছে তাদের বিরুদ্ধে আমরা সকলেই স্বোচ্ছার। কিন্তু প্রযুক্তির মাধ্যমে যে সকল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান খাদ্যকে বিষাক্ত করছে তারা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। 

স্বাস্থ্য রক্ষায় বাংলাদেশ সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে অনুচ্ছেদ ১৮(১) জনগণের পুষ্টিস্তর উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্যের উন্নতি এবং স্বাস্থ্যহানিকর ভেষজ নিষিদ্ধের কথা বলা হয়েছে। ১৮ক অনুচ্ছেদে প্রাণ, প্রকৃতিকে বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষন করার জন্য নির্দেশনা রয়েছে। তারপরও নীরব ঘাতক ও তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগীদের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে স্থবিরতা কারণগুলোই খুজে বের করা প্রয়োজন। 

একজন মানুষের পরিপূর্ণ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে পুষ্টিমান সম্পন্ন খাদ্যের প্রয়োজন। ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্য বন্ধ করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। 

খাদ্য নিরাপত্তা ও মান রক্ষায় সরকারের একাধিক প্রতিষ্ঠান, কিন্তু রয়েছে সমন্বয়হীনতা: 

খাদ্য নিরাপত্তা ও মান রক্ষায় বাংলাদেশের সরকারের একাধিক সংস্থার দায়িত্ব রয়েছে। সরকারের ৭টি মন্ত্রণালয় নিরাপদ ও মান সম্মত  খাদ্য নিশ্চিত করার সাথে সরাসরি জড়িত। এছাড়া বিভিন্ন অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার অধিদপ্তরগুলোর উপরও বিভিন্ন দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট করা রয়েছে। খাদ্য উৎপাদন, মজুদ, বিপনন, বাজারজাতকরণ, মূল্য নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য মান রক্ষার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, মৎস ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর, কৃষি অধিদপ্তর, প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর, মৎস অধিদপ্তর, বিএসটিআই, বিসিএসআইআর এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। এ সংস্থাগুলোর নীতিমালা, আইন ও কার্যপরিধিতে খাদ্য মান রক্ষা সংক্রান্ত সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। 

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পুলিশকে বিভিন্ন আইনের অধীন আইন বাস্তবাস্তবায়নে সহযোগিতা করার কথা উল্লেখ রয়েছে। খাদ্যের সাথে এ সকল মন্ত্রণালয়গুলোর সম্পৃক্ততা থাকলেও এ সংস্থাগুলোর একটির সাথে অন্যগুলোর সমন্বয় নেই। এ সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্য ও জীবন রক্ষাকারী ঔষধ লাগামহীনভাবে বিপনন ও বাজারজাতকরণ করা সম্ভব হচ্ছে। 

 খাদ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নীতিমালা : 

বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় কৃষি নীতি ২০১৩, জাতীয় খাদ্য নীতি ২০০৬, পুষ্টিনীতিতে খাদ্য নিরাপত্তা ও মান রক্ষার বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। এছাড়া জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি, জাতীয় নারীনীতি, শিশুনীতি, ক্রীড়ানীতি, জাতীয় যুবনীতিতে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে পুষ্টিমান রক্ষায় নানা ধরনের নির্দেশনা রয়েছে। 

 নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে মহামান্য আদালতের নির্দেশনা 

খাদ্যে রাসায়নিক, ভেজাল এবং ফরমালিন, কাপড়ে ব্যবহৃত রং ব্যবহারসহ নানা অস্বাস্থ্যকর উপায়ে খাদ্য উৎপাদন ও বাজার করার প্রবণতা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ১ জুন এক রিট পিটিশনের প্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট সরকারকে দেশের প্রতিটি জেলা ও মহানগরে খাদ্য আদালত (ফুড কোর্ট) স্থাপন এবং খাদ্য বিশ্লেষক ও খাদ্য পরিদর্শক নিয়োগের আদেশ দিয়েছিলেন । আদালত তার রায়ে বলেছে, “দেশের জনগণ অসুস্থ্য থাকিলে রাষ্ট্রের কোনো পরিকল্পনারই অগ্রগতি হইতে পারে না। এই সকল কারণে জনগণের সুস্বাস্থ্যের প্রতিবিধানকরণ প্রাধান্য পাইবার যোগ্য। কারণ ৩২ অনুচ্ছেদে ব্যক্তি জীবনের সুস্থ্যতা ব্যতিরেকে প্রজাতন্ত্রের সকল প্রচেষ্টাই সম্পূর্ণ বিফল হইবে। অতএব সংবিধানে বর্ণিত উপরোক্ত উদ্দেশ্য পূরণকল্পে বিশুদ্ধ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিতকরণ অতি জরুরি।”

২০১০ সালের ১৬ আগস্ট হাইকোর্ট আবার একটি আদেশ দিয়ে প্রশাসনকে খাদ্যে ভেজাল মেশানোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করার নির্দেশ দেন।

খাদ্যের সাথে জড়িত বিভিন্ন আইনসমূহ : 

নিরাপদ খাদ্য ও খাদ্য মান রক্ষা ও বাজার মূল্য নিশ্চিতে বাংলাদেশে প্রায় ২৫ টির মতো আইন সরাসরি যুক্ত রয়েছে। এ সকল আইনগুলো মানুষের খাদ্য উৎপাদন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মান নিয়ন্ত্রণে সাথে জড়িত। কতিপয় আইন বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণের সাথে সম্পৃক্ত। মোবাইল কোর্টে আইন ২০০৯ মাধ্যমে নিন্মক্ত বিভিন্ন আইনসমূহ প্রয়োগের বিধান রয়েছে।  

এ আইনগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ দ-বিধি ১৮৬০, বিষ আইন ১৯১৯, ক্যান্টনমেন্ট আইন ১৯২৪ (ধারা-৫৯, ২০৪, ২০৫), The Cantonments Pure Food Act 1966, অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৫৬, কৃষিপণ্য বাজার নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৬৩, কীটনাশক অধ্যাদেশ ১৯৭১, বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪, বাংলাদেশ হোটেল ও রেস্টুরেন্ট অধ্যাদেশ ১৯৮২, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড ও টেস্টিং ইন্সটিটিউশন অর্ডিন্যান্স ১৯৮৫, আয়োডিন অভাবজনিত রোগ প্রতিরোধ আইন ১৯৮৯, স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন ২০০৯, স্থানীয় সরকার  (পৌরসভা) আইন ২০০৯, ইউনিয়ন পরিষদ আইন ২০০৯, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯,  মৎস্য হ্যাচারি আইন ২০১০, মৎস্য খাদ্য ও পশুখাদ্য আইন ২০১০, পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১১, উদ্ভিদ সংগনিরোধ আইন ২০১১, প্রতিযোগিতা আইন ২০১২, বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট আইন ২০১২, মাতৃদুগ্ধ বিকল্প, শিশু খাদ্য, বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত শিশুর বাড়তি খাদ্য ও উহা ব্যবহারের সরঞ্জামাদি (বিপণন নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩, ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ আইন ২০১৩,  নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩, ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৫ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছে ।

দণ্ড-বিধি ১৮৬০ ও বিশেষ ক্ষমতা আইন 

বাংলাদেশে দ-বিধির ২৭২ ও ২৭৩ ধারায় খাদ্যে ভেজাল মেশানোর অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তির বিধান রয়েছে। ২৭২ ধারায় বিক্রির জন্য খাদ্য বা পানীয়তে ভেজাল মেশানোর দায়ে কোনো ব্যক্তিকে অনধিক ছয় মাস পর্যন্ত শাস্তির বিধান রয়েছে। ২৭৩ ধারায় ক্ষতিকর খাদ্য ও পানীয় বিক্রির অপরাধেও ছয় মাসের শাস্তির বিধান রয়েছে। ওষুধে ভেজাল মেশানো বা ভেজাল মেশানো ওষুধ বিক্রির জন্য দ-বিধির ২৭৪ ও ২৭৫ ধারায় সর্বোচ্চ ছয় মাসের শাস্তির বিধান রয়েছে।

১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়। এ আইনের ২৫(গ) এর ১(ঙ) ধারায় খাদ্যে ভেজাল, ওষুধে ভেজাল মেশালে বা ভেজাল খাদ্য ও ওষুধ বিক্রি করলে বা বিক্রির জন্য প্রদর্শন করলে অপরাধী ব্যক্তি মৃত্যুদ- বা যাবজ্জীবন কারাদ- বা ১৪ বছর কারাদন্ডে দন্ডিত হবে বলে বিধান করা হয়। এ ছাড়া ক্ষতিকর প্রসাধনী সামগ্রী বিক্রি বা বিক্রির জন্য প্রদর্শন (যা মানুষের দেহের জন্য ক্ষতিকর) করলে অপরাধীকে পাঁচ বছর পর্যন্ত বা যেকোনো মেয়াদের কারাদ- দেওয়ার বিধান করা হয়।

এ আইনগুলোতে প্রয়োগের প্রধান সমস্যাগুলো হচ্ছে, আইনগুলোর বাস্তবায়নের দায়িত্ব ও ক্ষমতা বিভিন্ন সংস্থার উপর। প্রতিটি আইনের ক্ষেত্র পৃথক এবং আইন প্রয়োগও সীমিত। এছাড়া নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি এ পর্যন্ত বাংলাদেশে গুরুত্বের সাথে দেখা হয়নি। ফলে আইনগুলোর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এ যাবত কোন ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি।

সরকারী গবেষণাগারসমূহের দায়িত্বশীলতা ও সমন্বয়ের অভাব

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার উপর ন্যস্ত রয়েছে। খাদ্যের মান পরীক্ষা ও তার আলোকে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তা জনগণকে অবহিত করা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার দায়িত্ব। এ দায়িত্ব প্রতিপালনে গবেষণাগারগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

সরকারী সংস্থার গবেষণাগারগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে - শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বিএসটিআই গবেষণাগার, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট গবেষণাগার, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন -এর গবেষণাগার , খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অধীন খাদ্য অধিদপ্তর-এর গবেষণাগার, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর-এর গবেষণাগার, পরিবেশ দূষণ মনিটরিং-এর জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষণাগার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন মৎস্য অধিদপ্তরের মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ গবেষণাগার, পশু রোগ পরীক্ষা এবং পশু ড্রাগ ও পোল্ট্রি ফিড নিয়ন্ত্রণের জন্য পশু সম্পদ বিভাগের গবেষণাগার, কৃষি কাজে ব্যবহৃত আমদানী ও রপ্তানীকৃত গাছপালা ও সবজির সঙ্গরোধ এবং কীটনাশক ও সার মনিটরিং-এর জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অদিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং-এর গবেষণাগার।

এছাড়াও রয়েছে আমদানীকৃত খাদ্যে তেজসক্রিয়তা মনিটরিং-এর জন্য বাংলাদেশ আনবিক শক্তি কমিশনের স্বাস্থ্য পদার্থ বিজ্ঞান গবেষণাগার, লবনে আয়োডিনের পরিমাণ মনিটরিং এর জন্য জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের গবেষণাগার, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের গবেষণাধর্মী খাদ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট। দুর্ভাগ্যবশত এসব পরীক্ষাগারগুলোর মধ্যে তথ্য ও অভিজ্ঞতা আদান প্রদান বা কোন প্রকার সমন্বয় নেই ।

আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা 

বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রণীত আইনগুলো প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে ক্ষেত্রে প্রশাসনিকবরাবরই দূর্বলতা লক্ষ্য করা যায়। এ সকল আইনগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দূর্বলতা, সরকারের সদিচ্ছা পাশাপাশি রয়েছে স্বার্থানেষী গোষ্ঠীর চাপ, প্রচারণা ও প্রপাগান্ডা। সরকার সদিচ্ছা ও প্রশাসনের দূর্বলতা দিকে বারবার দৃষ্টি প্রদান করা হলেও, স্বার্থানেষী গোষ্ঠীর প্রভাব সকলের দৃষ্টির অগোচোরে থেকে যায়। আর সার্বিক ফলফল জনস্বাস্থ্য হুমকিতেই থাকছে। 

নিরাপদ খাদ্য আইন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষন আইন এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড ও টেস্টিং ইন্সটিটিউশন অর্ডিন্যান্স এই তিনটি আইন নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতেখুবই গুরুত্বপূর্ণ। সর্বশেষ প্রণীত নিরাপদ খাদ্য আইনে সমন্বয় সাধনের লক্ষ্যে কতিপয় বিধান রয়েছে। তবে আইনটি প্রণয়নে বছর গড়িয়ে গেলেও বাস্তবায়নে সংস্থাগঠন, লোকবল নিয়োগ, দক্ষতা বৃদ্ধি, আইন বাস্তবায়নে পরিকল্পনা গ্রহণ, সমন্বয় সাধনের পরিকল্পনা ইত্যাদি চুড়ান্ত এখনো হয়নি। ফলে এ আইন এখনো মানুষের প্রত্যাশা পুরণ করতে পারেনি। ভেজাল ও বিষযুক্ত খাদ্য উৎপাদন ও বিপননকারীরা নিরবে আজো মানুষের জীবনকে ধ্বংশ করে যাচ্ছে।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে ধারাবাহিকভাবে যে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি

১) বাংলাদেশ খাদ্যে বিষক্ততা ও দুষণজনিত রোগ এবং মৃত্যু কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ;

২) নিরাপদ খাদ্য আইন বাস্তবায়নের জন্য সাংগঠনিক গঠন ও কার্যপরিধি চুড়ান্ত করা, লোকবল নিয়োগ, প্রশিক্ষন ও বাজেট প্রদান;

৩) ভোক্তা অধিকার সংরক্ষন অধিদপ্তর,বিএসটিআই এবং অন্যান্য সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয়ের রূপরেখা চুড়ান্ত করা;

৪) বিদ্যমান সরকারী গবেষণা সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় সাধন, খাদ্য সংক্রান্ত গবেষণার তাদের দক্ষতা নিরূপন এবং  রেফারেল ব্যবস্থা প্রর্বতন করা;

৫) গবেষণা সংস্থাগুলোর সহায়তায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খাদ্যের মানদন্ড নির্ধারণ; 

৬) স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান (ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন) সমূহকে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের লক্ষ্যে দায়িত্বশীল করা বা মনিটরিং করার দায়িত্ব প্রদান;

৭) খাদ্য মান রক্ষায় তদারকিতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় সাধনের ব্যবস্থা করা;

৮) খাদ্য দূষণকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোরমনিটরিং করার আওতায় নিয়ে আসা; 

৯) খাদ্য আদালতকে কার্যকর ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আদালতের জনবল, বাজেট ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা; 

১০) নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের উপর স্বার্থানেষী গোষ্ঠীর প্রভাব বন্ধে পৃথক নীতিমালা করা;

১১) জনসাধারণকে নিরাপদ খাদ্য আইন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সম্পৃক্ত ও ক্ষমতায়িত করা; 

১২) স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক খাদ্যজনিত রোগ ও মৃত্যু রোধে পরিকল্পনা ও  মনিটরিং ব্যবস্থা গ্রহণ করা; 

১৩) বাৎসারিকভাবে জাতীয় সংসদে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমের প্রতিবেদন প্রদান, সংসদ কর্তৃক কার্যক্রমের সফলতা মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা।

পরিসমাপ্তি : 

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এর গবেষণাগারে পরীক্ষার পর দেখা যায় যে, জুন ২০১২ সালে দিনাজপুরে লিচু খেয়ে ১৪ শিশুর মৃত্যুর কারণ ছিল কীটনাশক।  জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং সরকারী হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী দেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা আশংকাজনকহারে বাড়ছে। ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা ২০১২- ২০১৩ সময়কালে ২,৩২,৪৫৬ থেকে বেড়ে ৪,৭৬,২৬৫ তে দাড়িয়েছে। স্থানীয় টিউমার বিশেষজ্ঞ এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে বিষযুক্ত ও দূষিত খাবার গ্রহণের মাধ্যমে দেশের অনেক মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-র তথ্য মতে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ খাদ্যের বিষক্রিয়ার ফলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে ।

খাদ্যের ভেজাল ও বিষাক্ততা বর্তমান প্রজন্মের সাথে সাথে আগামী প্রজন্মের জন্য ক্ষতিকর। ক্ষমতাশালীরা নিজেরাই ভাল খাবার গ্রহণ করতে পারবেনযদি এ ধারণা করে, খাদ্য দুষণ নিয়ন্ত্রণ হতে বিরত থাকেন তবে তা ভুল হবে।থাইল্যান্ডের ব্যাংককস্থ বামুনগ্রাদ হাসপাতালের একজন বিশেষজ্ঞের মতে হাসপাতালের রোগীদের অর্ধেকই বাংলাদেশের। এদের মধ্যে বেশীর ভাগ কিডনী, লিভার ও প্রজনন সমস্যায় ভুগছে । খাদ্য উৎপাদনের প্রাথমিক পর্যায়ে ভেজাল, বিষ প্রয়োগ বা দুষণ প্রক্রিয়া শূরু করছে উৎপাদনকরীরা। যা সাধারণভাবে নির্ণয় করা কঠিন। খাদ্য আমাদের দৈহিক গঠন ও বির্বতনে ভুমিকা রাখে। আর তাই এই খাদ্যের মান রক্ষায় রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

খাদ্য নিরাপত্তা ও মান রক্ষার সাথে সরকারের ৭ টি মন্ত্রণালয় এবং ২৫ টি আইন রয়েছে। এ সকল আইনের মাধ্যমে খাদ্যের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মান রক্ষা, বাজারজাতকরণ নিশ্চিত, মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে এ লক্ষ্যে প্রয়োজন সকল মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তরগুলোর সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। সকল মন্ত্রণালয়গুলোর লোকবল, বাজেট, ক্ষমতার সমন্বয় করা সম্ভব হলে দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা কঠিন বিষয় নয়। সরকারকে আংশিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে দূরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে সকল মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে সমন্বিত করে কিভাবে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা যায় এ বিষয়টি ভাবতে হবে।

 

Style Selector

Layout Style

Predefined Colors

Background Image